All Public examination Results

মোশাররফ আপনাকে ক্ষমা করতে পারলাম না….








একটি বিশেষ প্রজাতি রয়েছে, যাদের ধর্মীয় অনুভূতি ভীষণ নরম। কাদামাটির একটা নরম পিণ্ডের মতো। ছুঁয়ে দিলেই ভেস্তে গেল, ভচকায়ে গেল, ভেঙে গেল বলে রব উঠে যায়। এই রবে সামিল হয় অশিক্ষিত, পড়াশোনা না জানা, কিংবা কম জানা এক শ্রেণী। এদের মস্তিষ্ক থাকে সাদা ফকফকা- পুরোটাই খালি। এই সাদা ফকফকা মস্তিষ্কে ধর্মীয় অনুভূতি থাকে টনটনে।

অতএব, ওই পূর্বে বর্ণিত প্রজাতি যদি হালকা একটু আভাস দিয়ে যায়, ‘এইটা নাস্তিক, কাফেরের কাজ’ অমনি ওই অশিক্ষিতের সাদা মস্তিষ্কে তার আঁচড় পড়ে। এবং দা, বল্লম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়- মার শালারে, কোপা শালারে বলে।

মোশারফ করিম

এটা আজকের লেখার বিষয় না। বিষয় হলেন মোশাররফ করিম সাহেব। তার নাটক-অভিনয়ের খুব বড় একজন ফ্যান আমি কখনোই ছিলাম না। তবু তার অভিনয়ে হাসির খোরাক ভালো লাগতো। মন খারাপ হলে অন্যের শেয়ার করা তার নাট্যাংশ দেখে হাসতাম। দেশের হাস্যরসাত্মক অভিনেতার মধ্যে তিনি অগ্রগণ্য, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

কিন্তু করিম সাহেব একটা ছোট্ট ভুল করে ফেললেন। শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, তিনি এবার বাস্তব জীবনেও নিজেকে হাসির খোরাক করলেন। একজন অভিজ্ঞ শিল্পী যখন ক্যামেরার সামনে আসেন, তাকে ন্যুনতম কিছু দায়িত্ববোধ নিয়ে আসতে হয়। সেই দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করেন। তিনি জানেন- অসংখ্য মানুষ তাকে অনুসরণ করে, তার কথা শোনে।

অতএব এমন কোনো কথা পারতপক্ষে এদেশিয় ‘সেলিব্রিটি’রা বলতে চান না, যেগুলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া জন্ম দিতে পারে। হোক সেটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিংবা ন্যায়ের পথে আন্দোলন।

মোশাররফ সাহেবের উপস্থাপনায় ‘চ্যানেল টোয়েন্টিফোর’ এর অনুষ্ঠানটির চুম্বক অংশ বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে আমার। দেখে সত্যিই বেশ ভালো লাগছিলো। এবার অন্তত একজন শিল্পী এগিয়ে এলেন নারীর প্রতি সহিংসতার বিপক্ষে কথা বলতে, নারীর পাশে দাঁড়াতে যা এই সভ্য যুগেও ভীষণ বিরল। অন্তত দেশের অগ্রগণ্য শিল্পী সমাজ তো এসব বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেই বসে থাকেন। না জানি- কী বলতে গিয়ে নিজের ইমেজই হারাতে হয়, নিজের ফেইম খোয়াতে হয় দর্শকের কাছে।

মোশাররফ আপনাকে ক্ষমা করতে পারলাম না

আরও দেখুনঃ

তো, অনুষ্ঠানটা দেখবার পর ক্ষুদ্র আশা সঞ্চার হয়েছিলো মনে- এবার কী তবে এক এক করে সকলে মুখ খুলবেন? ধর্ষণের জন্যে পোশাক দায়ী- এই মানসিক বিকারগ্রস্তদের সংখ্যা কি তবে কমবে এবার? নিশ্চয়ই কমবে। করিম সাহেবের মতো করে প্রতিটা সেলিব্রেটি যদি নিজ নিজ অনুসারীদের এভাবে করে বোঝাতে পারেন, তরুণ প্রজন্মকে মোটিভেটেড করতে পারেন, তাহলে নিশ্চয়ই কমবে।

কিন্তু, হলো না। এক-দুই দিন যেতে না যেতেই বাড়া ভাতে ছাই পড়লো আমার, কিংবা আমাদের। (যেহেতু আমি বিশ্বাস করি, আমি একা নই) মোশাররফ করিম অতঃপর নিজের ‘ভুল’ বুঝতে পেরে সেই মসৃণ পথেই হাঁটলেন। যে পথে হাঁটলে তাঁর দর্শক কমবে না, তাঁর হাস্যরসাত্মক নাটকে কোনো ছেদ পড়বে না, কিংবা কোনো ধর্ম ব্যবসায়ী-উগ্রবাদী তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল ফটোতে এসে দুই-তিনটা গালি দিয়ে যাবে না। এমনই সুন্দর, মসৃণ পথ বেছে নিলেন তিনি হাঁটবার জন্য।

মাফ চাইলেন সকলের কাছে। সেই অনুষ্ঠানটির জন্য। ভুলে গেলেন- একদল শিক্ষিত, আলোকিত মানুষ রয়েছে, যাদের কাছে তিনি রোল মডেল হয়েছিলেন- সেই বক্তব্যের পর থেকে। ভুলে গেলেন, দেশটা শুধু মূর্খ এবং ‘পটেনশিয়াল ধর্ষকদের’ আখড়া না। এরা নারীর পোশাকে নজর দেয় না। ঘামে ভেজা নারীদেহে লেপ্টে থাকা কাপড় দেখে তাদের জিভ লকলক করে না, বরং একটু আফসোসের শব্দ বেরিয়ে যায়- আহা কত কষ্ট করছে মেয়েটা। মোশাররফ, আপনি নাটক ব্যবসার খাতিরে ভুলে গেলেন, দেশে আপনার নাটক শুধু রিকশাওয়ালা ধর্ম ব্যবসায়ীরাই দেখে না, দেখে কিছু সচেতন মানুষও। যাদের স্ত্রী-কন্যা কিংবা মা-কে বাইরে গিয়ে কাজ করতে হয় দু পয়সা বাড়তি রোজগারের জন্য। তাদের পোশাকের দিকে যখন আঙুল তুললেন, তাদের হৃদয় থেকে আপনার শ্রদ্ধার জায়গাটা মুছে গেল চিরতরে।

আপনি সব ভুলে গেলেন মোশাররফ করিম। ধরে রাখলেন যত নোংরা-আবর্জনা এবং তাদের কুৎসিত কিছু মানসিকতা।

মসৃণ পথেই হাঁটুন আপনি- অন্য সবাই যেমন হাঁটছে। সুন্দর হোক আপনার পথচলা।

তবে জানেন? একদিন দিন বদলাবে, সত্যিই বদলাবে আমরা বিশ্বাস করি। খুব অল্প কজন সাহসী নেতার হাত ধরেই বদলাবে। কিন্তু অন্তর থেকে বলছি করিম সাহেব, আপনাকে এই ক্ষমা চাইবার জন্য আমরা ক্ষমা করতে পারবো না- কোনো দিন না।

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম-এ প্রকাশিত লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম ও জুমবাংলার সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

সূত্র : প্রিয়.কম

Loading...