All Public examination Results

মাহি আর মেঘের গল্প! পড়লে আপনার মানসিকতাও পরিবর্তন হবে








বার্লিনের একটা আবাসিক হোটেলের লবিতে বসে আছি। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে অনলাইনে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে চোখ বোলাচ্ছিলাম। গাড়ির জন্য অপেক্ষা। জার্মানির সদ্যগঠিত কেবিনেটে যুক্ত হওয়া একজন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হবে। এরপরে জার্মানির সংসদ তথা বুন্দেসটাগে গিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কথা শুনবো। মনে মনে সেই আলাপচারিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বহুদিন ধরেই তাদের কাছে কিছু বিষয় জানার আগ্রহ ছিলো। আজকে সুযোগটি এসে গেলো।

জার্মানিতে থাকলেও বহুদিন পরে সময় নিয়ে, ইচ্ছেমতো বার্লিন শহরে ঘুরে বেড়াবো! ঐতিহাসিক বার্লিন ওয়াল, আলেক্সাণ্ডার প্লাটজ, ব্রান্ডেনবুর্গার টুর, স্প্রী নদী, বুন্দেসটাগ, কার্ল মার্ক্স, আলবার্ট আইনস্টাইনের স্মৃতিবিজড়িত হুম্বোল্ট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস, আরো কতো কী! ২০০৯ এবং ২০১২ সালে বার্লিনের আইআইজে’তে জার্নালিজম ফেলোশিপ করার সময়গুলো বেশ উপভোগ্য ছিলো। তখন পায়ে হেটে, বাইসাইকেলে, ‘উ-বাহন’, ‘এস-বাহনে’ করে গোটা শহর চষে বেড়াতাম। পরিচিত জায়গাগুলোর স্পর্শ নষ্টালজিয়ায় পেয়ে বসেছিলো। কিন্তু বাইরে বের হবার মুহুর্তে একটা ভীষণ মন খারাপ করা সংবাদ উষ্ণ আনন্দযাত্রায় যেন ঠান্ডা জল ঢেলে দিলো। খুব অচেনা, অদেখা একটা মানুষের দু:সংবাদ। পড়তে পড়তেই বুকটা ভারী হয়ে উঠলো। চোখের কোনায় ভেজা কোন কিছু স্পর্শ করলো। তা্ই চলতে চলতেই স্মার্টফোনেই ভুলভাল কিছু লেখার চেস্টা।

আফসানা আবিদ নামে একজন মানুষ আমাদের সবাইকে ছেড়ে তার ভালোবাসার মানুষের কাছে চলে গেছেন! নাম শুনে মানুষটিকে হয়তো অনেকেই চিনতে পারছেন না!

তিনি নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত পাইলট আবিদ সুলতানের প্রিয়তমা সহধর্মীনী! স্বামীর অকাল মৃত্যুর শোক কোনমতেই কাটিয়ে উঠতে পারলেন না! তবে এভাবে চলে যাবার আগে নিজের কলিজার টুকরা ছেলেটার কথা একটিবারও ভেবেছেন কী না, কে জানে! কল্পনায় আমার দৃষ্টি কিশোর তানজিদ সুলতান মাহির অদ্ভুত মায়াময় চোখে। মাহির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বোঝার চেস্টা করছি তার অনুভূতি। ওই চেস্টাটুকুনই যা। চিন্তাটাকে আর সামনে টেনে নিয়ে যেতে পারছি না। মা হারানোর কস্ট কি অন্য কেউ কোন দিন বুঝতে পারে।! কিংবা বাবা হারানোর! নির্মম হলেও এটাই ধ্রুব সত্য যে, তানজিদ এখন মা-বাবা হারা একজন ইয়াতীম সন্তান। এলবামের ছবিগুলো কিংবা দেয়ালে বড় কোন পারিবারিক ছবি দেখে দেখেই তার বাকীটা জীবন পার হয়ে যাবে। আর কোনদিন ভুল করেও মাঝ রাতে বাবা তার রুমে ঢুকে ঘুম ভাঙ্গানোর চেস্টা করবে না! ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠি, মা-বাবাহীন শুন্য বাড়িতে জীবনের বাকী দিনগুলো কীভাবে কাটবে ছোট্ট এই ছেলেটির! কোন এক কূয়াশা ঢাকা শীতের সন্ধ্যায় ওই দূর আকাশের সন্ধ্যা তারা হতে তানজিদের বাবা-মা হাত ধরাধরি করে হাটতে হাটতে প্রিয় পুত্রকে দেখার জন্য একটিবারও কি চলে অাসতে পারেন না। বাবা মায়ের ডাকা তানজীদেরও হয়তো ছোট্ট সুন্দর কোন নাম ছিলো। ড্রয়িং রুমের সোফায় হেলান দিয়ে বাবা কি সেই নামটি ধরে ডাকতে পারেন না! অথবা পড়তে পড়তে ক্লান্ত মাহির ঘাড়ে মায়ের মমতা মেশানো হাতের স্পর্শ, নিদেন পক্ষে সেই চিরচেনা মায়ের চুড়ির টুংটাং শব্দ অথবা তার মিস্টি বকুনি ! যারা চলে যায়, তারা কি সবকিছু নিয়ে, বাকীদের সর্বশান্ত করে দিয়ে চলে যায়!

জীবন কখনো কখনো কতো নির্মম, নিষ্ঠুর হতে পারে, মাহি তার এক জীবন্ত উদাহরণ! বেঁচে থাকাটা দু:স্বপ্ন হয়ে যেতে পারে ক্ষণিকের দুর্ঘটনায়। কোন কিছু না জেনে, চোখ বুঝেই বলে দেয়া যায় এক প্রকার সোনার চামচ মুখে দিয়েই তানজিদ সুলতান মাহির জন্ম হয়েছিলো। পাইলট বাবা আকাশে উড়তে উড়তে নানান দেশ বেড়াতেন। যেখানেই নামতেন, আর কারো জন্য কিছু না হলেও প্রিয় পুত্রের জন্য কিছু না কিছু তো আনতেনই। অসময়ে হয়তো কাজ সেরে ঘরে ফিরতেন। আদুরে পুত্র বাবার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অভিমানে গাল ফুলিয়ে হয়তো ঘুমিয়ে পড়তো। বাবা এসে কপালে চুমু খেয়ে যখন ঘুম ভাঙ্গাতেন, তার আর অভিমান কাটতো না! অনেকবার সরি বলে, আরো কিছু আব্দার মিটিয়ে তবেই রাজপুত্রের মান ভাঙাতো। ঘুম ঘুম চোখেই মা তার ঘুম ভাঙ্গাতো! ভীষন অনিচ্ছা নিয়ে সত্ত্বেও স্কুলের জুতা পরতো। প্রস্তুতির ফাকেই মা কিছুটা জোর করেই নিজ হাতে সকালের নাস্তাটা খাইয়ে দিতো! তারপরে তড়িঘড়ি স্কুলের পথে। আমাদের সময়ের সহকর্মী প্রিয় মিথুন মাহফুজের ( Mithun Mahfuz ) লেখা প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম : মাহি একেবারে নির্বাক হয়ে গেছে। তার মুখ থেকে কোন কথা বের হচ্ছে না। মা-বাবা হারানোর শোক হয়তো তাকে পাথর করে দিয়েছে। মায়ের মৃত্যু সংবাদেও তার চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ছে না। মাহি যদি চিৎকার করে কিছুক্ষণ কাদতে পারতো, যদি কাউকে জড়িয়ে ধরে কেদে বুক ভাসাতে পারতো! মিথুন মাহফুজের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, মাহির মা আফসানা আবিদও স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ শুনে এভাবে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর স্ট্রোক, মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ এবং হৃদয়বিদারক এই চলে যাওয়া।

আরও দেখুনঃ

মাহি’র কথা মনে করতেই সহকর্মী সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির আদরের সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘের কথা খুব মনে পড়ছে। সাত বছর আগে, ২০১২ এর ১১ ফেব্রুয়ারী, এর চেয়েও নির্মম এক ঘটনায়, আততায়ীর নৃসংসতায় পুত্রের সামনেই একে একে খুন হন সাগর ও রুনী। জানি না, মেঘ এখন কেমন আছে! মাঝ রাতে বাবা মায়ের কথা তার মনে পড়ে কী না! সাগর-রুনী হত্যার সাতবছর উপলক্ষ্যে কিছুদিন আগে বাংলা ট্রিবিউনে একটা ফিচার দেখলাম। সেই ছোট্ট মেঘ এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। পড়ালেখার পাশাপাশি ক্রিকেট তার পছন্দ। বড় হয়ে বাবা-মায়ের মতো সংবাদিক হবার কোন ইচ্ছা নেই। তার ধ্যান-জ্ঞান ও স্বপ্ন এখন একজন ক্রিকেটার হবার। সাকিব আল হাসান তার মোস্ট ফেবারিট ক্রিকেটার। বিধাতার কাছে প্রার্থণা করি মেঘ যেন তার স্বপ্নের আকাশেই হাসি-আনন্দ নিয়ে সারাজীবন বিচরণ করতে পারে। আর কোন কষ্ট যেন কোনদিন তাকে ছুঁইতে না পারে!
এনী প্রিয়কের গল্পটা অন্যরকম।

এনীর জীবনের অনাগত দিনগুলি কী নিয়ে বাঁচবে, সেই প্রশ্নটার কোন উত্তর খুঁজে পাই না! প্রিয়তম স্বামী, আলোকচিত্রী এফএইচ প্রিয়ক আর তার প্রিয়কন্যা তামাররা বিধ্বস্ত ইউ-এস বাংলার দাউদাউ আগুনে নিমিষেই জ্বলে-পুড়ে নি:শেষ হয়ে গেছে। স্রষ্টার কোন্ অদ্ভুত ইচ্ছায় অলৌকিকভাবে এনী বেঁচে গেছে। কিন্তু এতো বিশাল শোকের পাথর বয়ে নিয়ে বাকীটা জীবন কীভাবে পার করবে? বিশাল আকারের কফিনে শুয়ে তামাররা যখন বাবার সঙ্গে বিমানে করেই ঢাকায় ফিরে এসে নামলো, মা তখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সাংবাদিক সহকর্মী প্রিয়জন আরটিভির জুলহাস কবীর সুজন (Zulhas Kabir Sujon) নেপালের হাসপাতালে এনীর সঙ্গে একটুখানি কথা বলার চেস্টা করছিলো। এনীর দুর্বল কণ্ঠের হাহাকার হাসপাতালেরে এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো ! এনী বুঝাতে চেস্টা করছিলো তখনকার বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। তার কথায় কেমন একটা অপরাধবোধ জেগেছিলো! নিজেকে বারবার প্রশ্ন করছিলো, কেন প্রিয় সন্তানকে রেখে সে বিমান থেকে বের হয়ে আসলো। নিজের জীবনটা বাঁচালো? একজন মায়ের কষ্ট কোনদিনও মা ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারবে না। তবে এটাই সত্য, যে তামাররাকে বাাঁচাতে বাবা তার নিজের জীবন দিয়ে ভালোবাসার প্রমান দিয়েছে। একটুখানি সুযোগ পেলে মা এনী হয়তো তারচেয়েও বহুগুণ স্যাক্রিফাইস করতে সক্ষম হতো। কিন্তু বিধাতার বিধান তো এমনই!

ওই বিমানের যাত্রী কবীর হোসেনের শরীরের সিংহভাগ পুড়ে গেছে। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন জানান, তার অবস্থা আশংকা জনক। কবীরকে এখন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। স্বজনেরা জানেন না, তাদের জন্য কী সংবাদ অপেক্ষা করছে।

কাঠমান্ডু ট্রাজেড়ির আরেক বিষাদময় চরিত্র সুখেন্দু বিকাশ রায়। তার মতো দুর্ভাগা আর কয়জন আছে! প্রিয় সন্তান পিয়াস রায়ের জীবনও কেড়ে নিয়েছে অভিশপ্ত ইউএস-বাংলার বিএস ২১১ উড়োজাহাজটি। ছেলেটিকে শেষবারের মতো দেখাবেন – স্ত্রীকে হয়তো এই শান্তনা দিয়েই সুখেন্দু রায় কাঠমান্ডুতে উড়ে গিয়েছিলেন। গত ১৯ মার্চ পচিশটি নিথর দেহ নেপাল থেকে বাংলাদেশে ফিরে এলেও পিয়াসের ডিএনএ টেস্টের জটিলতার কারণে তার গৃহে প্রত্যাবর্তণ অনিশ্চিত হয়ে যায়। ডিবিসি নিউজের সাংবাদিক আদিত্য আরাফাতের ফেসবুক পেজে সুখেন্দু রায়ের ফ্যালফ্যাল দৃস্টিতে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকা ছবিটা দেখে বুকের মধ্যে শক্ত একটা মোচড় দিলো! একে একে নিথর দেহগুলো কফিনে শুয়ে বাংলাদেশের পথে যাত্রা করছে। একটু দূরে দাড়িয়ে তিনি সেই চলে যাওয়া দেখছেন। সন্তানের মুখখানি একটিবার দেখবেন, সেই সাধটুকুনও কি পুরণ হবে না সুখেন্দুর!

প্রতিদিনই নানান দুর্ঘটনায় আমরা কেউ না কেউ তাদের স্বজন-পরিজনকে হারাচ্ছি। স্বাভাবিক মৃত্যুগুলোর শোকই কোনভাবেই কাটিয়ে ওঠা যায় না! এর কোন সান্তনা নেই, হয় না। শুধু মাঝ রাতে অন্ধকারে বুকফাটা আর্তনাদের মাঝেই শান্তনা খুঁজে নিতে হয়! কেউ হয়তো শোকে পাথর হয়ে আফসানা আবিদের পথ বেছে নেন। আর বাকীরা দু:খে-শোকে কাতর। জীবন্মৃত্যু হয় অবশিষ্ট জীবন পার করতে হয়!

Loading...