All Public examination Results

বিমান দুর্ঘটনায় নিহত স্বামীর কাছে তরুণীর চিঠি!

সেই দিন ছিল বৃহষ্পতিবার। মা জানালেন, আগামী বুধবার আলীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। আমি ভাবতে পারি না, কখন যে তিন’শ পঁয়ষট্টি দিন পেরিয়ে গেছে! টেরও পেলাম না। কিভাবে টের পাবো? কত আগেই তো আমি কাঁচের মতো খন্ড-বিখন্ড হয়ে গেছি সহস্র টুকরোয়। আমি চিৎকার করে কাঁদতে চাই। আর কাঁদতে পারি না আলী। চোখের পানি যে কবেই শুকিয়ে গেছে।

আর কাঁদতে পারি না। শোক করতে পারি না। ভুলতে পারি না। তোমার সঙ্গে থাকা চারটি মাস। এটাই আমার পুরো জীবনের সারাংশ। আমার শেষ হাসি। এখন আমি একজন বিধবা মা। হায় সময় কত দ্রুত চলে যায়!

মাত্র একটি বছর। একটি বছরেই আমার কতো অভিজ্ঞতা। মিস থেকে মিসেস, মিসেস থেকে বিধবা। এখন বিধবা মা! তাই সেই দিনের কথা স্মরণ করতে ভয় পাই। হায়! আমি কতো অসহায়। দিনটি আজো মনে ভয়াবহ ভাবে গেঁথে আছে।

সেই দিন ছিল খুব সুন্দর সকাল। তুমি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। এখনও মনে করতে পারি, তোমাকে বলেছিলাম, ‘চা টা শেষ করে যাও’। চিন্তা করেছিলাম, তুমি অবশ্যই ইসলামাবাদ পৌঁছবে। বারবার ফোন দিচ্ছি, তুমি ধরছো না। তোমার এই অভ্যাসটা আমার খুব অপছন্দ। তুমি কখনোই প্রথম কলেই আমার ফোনটা ধরো না। ফোন ছুঁড়ে দিয়ে টিভি চালু করলাম।

সকালে সিনেমা দেখি। এরপর রান্না চড়াই। আবার ফিরে এসে নাটক দেখি। রিমোট দিয়ে এক চ্যানেল হতে অন্য চ্যানেলে যাচ্ছি। হঠাৎ এক চ্যানেলের সংবাদে আমি হতভম্ব হয়ে যাই! আমার হাতটা অবশ হয়ে যায়। হয়তো পুরো শরীরটাও। ইসলামাবাদ…বৃষ্টিস্নাত দিন…মারগালা পাহাড়…এয়্যারব্লু দুর্ঘটনা। না ভাবতে পারছি না। আলী তোমার আসন নম্বর তো ২১।

কি করবো, বুঝতে পারছি না। প্যারালাইজড হয়ে গেলাম। কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। মনে প্রাণে প্রার্থণা করছি তুমি যেন বেঁচে যাও। টিভিতে অক্ষরে অক্ষরে তোমার নাম দৃশ্যমান হচ্ছে। তুমি কি বেঁচে আছো, নাকি…? আশ্চর্য আমি সেই মিথ্যাবাদী, যে তোমাকে ছাড়া মারা যাওয়ার কথা বলতো। অথচ দেখো আমার প্রাণ কতো কঠিন। এখনো আমার হৃদষ্পন্দন আছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছি। বেঁচে আছি।

মনে হচ্ছে, আমার সময় থেমে আছে! বিমান দুর্ঘটনা আমার সকল অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে গেছে। এখন আমি কখনও জীবিত, কখনও মৃত। প্রতিদিন একবার বাঁচি, একবার মরি। খুব ইচ্ছে হয় তোমার কাছে চলে আসি। কিন্তু ছোট্ট ‘দোয়া’ আসতে দেয় না।

আলী, জানো আমাদের ছোট্ট ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। ওর নাম রেখেছি- দোয়া-ই- আলী। দোয়া হুবহু তোমার মতো। সেই হাসি, সেই চোখ, সেই কপাল। আমি খন্ড-বিখন্ড হই, যখন কেউ ওকে এতিম বলে ডাকে। আলী ফিরে এসো। তোমার মেয়ে বাবা-বাবা বলে ডাকছে।

আলী, আমি একা বিশ্বের মুখোমুখি হতে পারি না। তোমাকে প্রয়োজন। খুবই প্রয়োজন। আলী, আমি একা। প্লিজ, আমার এই একাকিত্বকে হত্যা করো। আমার ফোনটা ধরো। দোয়াকে তোমার কোলে তুলে নাও। আমাকে বুকে চেপে ধরো, শক্ত করে। তোমাকে খুব প্রয়োজন আমার। তোমার কাঁধটা দাও একটু মাথা রাখবো।

তোমাকে ছাড়া আমি অর্থহীন, অন্ধ, বধির, বোবা, প্যারালাইজড। ফিরে এসো আলী, ফিরে এসো। আমি আমার সেই হাসি ফিরে পেতে চাই। তোমাকে সমাহিত করার কথা ভাবলে আমার শিরদাড়ায় ঠান্ডা হিম বয়ে যায়। আজ আমি যেন খাঁচাবন্দি পাখি। আমি উড়তে চাই। প্রতি রাতে স্বপ্নে তোমাকে দেখি, অনুভব করি। যদিও জানি তোমার-আমার মাঝে যোজন যোজন দুরত্ব। এক পৃথিবী ব্যবধান।

২০১০ সালের ২৮ জুলাই বুধবার। সেই দিন খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে এয়্যারব্লু-২০২ বিমানটি রাজধানী ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা ছিল। পথে অ্যাবোটাবাদ জেলায় হেভেলিয়ানে বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। বিমানের আরোহীদের কেউ বাঁচতে পারেনি। সবাই এমনভাবে দগ্ধ হয়েছেন যে, চেনার উপায় ছিল না। পাকিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম এই বিমান দুর্ঘটনায় ১৫২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ আলী মুঘল। বিয়ের চার মাসের মাথায় নিহত এই তরুণ ব্যবসায়িক কাজে ইসলামাবাদ যাচ্ছিলেন। মারা যাওয়ার এক বছর পর ফেসবুকের একটি গ্রুপে তাঁর স্ত্রীর এই করুণ আর্তনাদ প্রকাশিত হয়।

 

Loading...